স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ; বিশ্ব অবাক চেয়ে রয়

1 month ago 29

শেহরীন সহিদ হৃদিতা, চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি, টেকজুম ডটটিভি// “পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের
কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের;
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ।
একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস,
আপোস করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস।”

বাংলাদেশ; এ দেশ বাংলার, এ দেশ বাঙালির। এই সেই দেশ যে দেশের এক হাতে থাকে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী , অন্য হাতে রণতূর্য। এই সে দেশ যেখানে নিজ ভাষায় গান গেয়ে চাষি ধান কাটে , মাঝি দাঁড় বায়। এই সেই দেশ যেখানে সেই নিজের ভাষাকে বাঁচাতেই রাজপথকে নিজের রক্ত দিয়েই রঞ্জিত করতে হয়। এই সেই দেশ যেখানে নিজের সত্ত্বাকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ দিতে হয়েছে। এই সেই দেশ যেখানে এখন অনিয়ম আর দূর্নীতি রোধ করতে প্রান পণ লড়াই করতে হয়, এই সেই দেশ যে দেশে একটা আহবানেই সমগ্র জাতি একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো সকল অশুভকে দূরীভূত করতে। এই সেই বাংলা , এই সেই দেশ।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে গণ্য করা হতো বাংলাকে। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভাগের পর শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।অথচ প্রায় ১৪’শ মাইল দূরত্বের দুই প্রদেশের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, ভৌগলিক ,অর্থাৎ প্রায় সবধরনের পার্থক্যই বিদ্যমান ছিল। ইংরেজ শাষনামল থেকে মুক্তি পেয়েও , সত্যিকার অর্থে মুক্তির স্বাদ পায়নি এই বাংলার মাটি।প্রথমেই সমগ্র পাকিস্তানের শাষনভার করায়ত্ত করে নেয় পশ্চিম পাকিস্তান। এরপর বারবার নানা ভাবে, নানা দিক দিয়ে পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার উপর আঘাত হানতে থাকে।সহজ অর্থে, শোষন করতে থাকে।

প্রথম আঘাত আসে এই বাংলার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতির উপর। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ, পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় রেসকোর্সের এক জনসভায় ঘোষণা করে দেন যে, “উর্দু-ই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাস্ট্রভাষা”।সম্পূ্র্ণ অযৌক্তিক এই ঘোষনার তুমুল বিরোধিতা করে বাংলার সাধারন মানুষ। কিন্তু ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের নব প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনও একই ঘোষনা দিলে পূ্র্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে করা মিছিলে ছাত্র-জনতার উপর হামলা চালায় সরকার পক্ষের পুলিশ বাহিনী। প্রান হারায় রফিক,বরকতের মতো অনেকেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই একমাত্র ঘটনা যেখানে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে রক্তে রঞ্জিত করতে হয়েছে রাজপথ।

এই নিষ্ঠুরতাতেই থেমে যায়নি পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকরা। শাষনামলের শেষ অবধি যেমন তারা পূর্ব বাংলাকে অর্থনৈতিক, সামাজিক , সংস্কৃতিক অর্থাৎ প্রায় সবক্ষেত্রেই অমানবিক এবং নির্মমভাবে শোষন করে গেছে, তেমনি শেষ পর্যন্ত তারা তাদের এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ অব্যহত রেখেছে।

সাল ১৯৭১। মার্চের এক মধ্যরাতে অতর্কিত হামলা শুরু হলো ঢাকার রাস্তায়। ঘুমন্ত নিরীহ মানুষের প্রতি অকাতরে গুলি চালিয়েছিলো শোষকবাহিনীর প্রেরিত মিলিটারি এবং সামরিক সৈন্যরা। সমগ্র ঢাকা শহর, তখন লাশের শহর। ঘুমন্ত শিশু মায়ের কোলেই গুলিবিদ্ধ, নববধূ, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার গৌরবময় ইতিহাস। ঢাকার পিলখানা ইপিয়ার ক্যাম্প, রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প সহ গুরুত্বপূর্ন সামরিক এলাকায় একযোগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে শত শত পুলিশ, আনসার ও ইপিআর সদস্যকে, লুন্ঠন করে অস্ত্রাগার। প্রায় গুঁড়িয়ে দেয় ভবনগুলো।

ঢাকার ইপিআর সদর দপ্তর পিলখানার বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করে এবং ইপিআর দফতরের সবটাই দখল করে নেয় ২২তম বেলুচ রেজিমেন্ট। রাজারবাগে গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দফতর। বাংলার ১১শ পুলিশ সন্তানের রক্ত ঝরিয়ে, সমগ্র ব্যারাক গুঁড়িয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সবকিছু। ১৮ নং পাঞ্জাব, ৩২ নং পাঞ্জাব ও ২২ নং বেলুচ রেজিমেন্ট ট্যাংক ও মর্টার হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে ঐ রাতেই জহুরুল হক হলের প্রায় ২০০ ছাত্রকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে পাকবাহিনী। রোকেয়া হলে তখন চলেছে নারী শিক্ষার্থীদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং হত্যাযজ্ঞ।আনুমানিক ৩০০ জন ছাত্রীকে সে রাতে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ঘটে নৃশংসতম হত্যার ঘটনাটি।

সেই ভয়াবহ রাতটি ছিলো ২৫শে মার্চ, যা ইতিহাসে কাল রাত্রি নামে পরিচিত। গণহত্যার নৃশংসতম দিকটি সারা বিশ্ব হতভম্ব হয়ে দেখেছিলো এই রাতে।পাকিস্তানি শাষকদের কাছে এই নির্মম গণহত্যার লক্ষ্য ছিলো বাংলাকে চিরতরে দমিয়ে দেওয়া । খুঁজে খুঁজে দেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি এবং তরুণ প্রজন্মকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলো তারা , তাই এই হত্যাকান্ডের অফিসিয়াল নাম ছিলো_ “অপারেশন সার্চলাইট”। এই গণহত্যার স্বীকৃতি কিন্তু পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেই রয়েছে। পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই প্রকাশ করেছিলো যে -১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।

২৫শে মার্চ রাত ১১টায় সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিলো, যার রেশ আর প্রভাব রয়ে গেছে আজ তার ৫০ বছর পরে এসেও। সেই মধ্যরাতেই পরিচালিত হয় পাকবাহিনীর আরেকটি অভিযান‘অপারেশন বিগবার্ড’। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। আর গ্রেফতারের আগে; ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যে কোন মূল্যে বাংলাকে শত্রুমুক্তের আহবান জানান। সেই আহবানেই এই বাংলা মায়ের হাজারো অদম্য সাহসী সন্তান ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। চোখ জোড়া স্বপ্ন দেশকে স্বাধীন করার, দেশমাতা-কে মুক্ত করার।রাতের আঁধারে শত্রু দূর্গে হানা দিয়েছেন নতুন ভোরের সন্ধানে। এই ঘুমের দেশের ঘুম ভাঙাতে ঘুমিয়ে পড়ছেন সাহসিকা জননী বাঙলার দামাল ছেলে-মেয়েরা।ম৯ মাস ধরে ৩০ লক্ষ প্রাণ আর ১০ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই বাংলা পেয়েছে স্বাধীনতা-র আস্বাদ। বড় নির্মম, বড় কঠিন সে পাওয়া।

১৯৪৭ সালে যখন শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য-ই একটি স্বতন্ত্র রাস্ট্রের দাবি তোলা হয়, তখন এই বাংলার মানুষেরও সম্মতি ছিলো। কিন্তু সেই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ২৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষ মুক্তির আশায় উত্তাল হয়ে উঠেছিলো। স্বাধীনতা নামক এই বস্তুটার প্রতি এতো গভীর মোহ কেন ছিলো বাঙালীর? এর পিছনের কারণগুলো কিন্তু নেহাত-ই ছোট নয়। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান- এই দুটি প্রদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, প্রসাশনিক, প্রতিরক্ষা- এই সব বিষয়ে-ই ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম বৈষম্য আর শোষনের চিহ্ন। আর এই শোষণ এতটাই বেশি ছিলো যে তা বাঙালির জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধিকার চেতনাকে উত্তেজিত করে তুলেছিলো।

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই রাস্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হতো পশ্চিমা অংশ থেকেই। আর বাঙালিদের “দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক” হিসাবেই দেখা হতো। পরিসংখ্যান মতে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ। অথচ পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৫০-৫৫), কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের মাত্র ২০ শতাংশ পেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান।১৯৫৫-৫৬ অর্থবছরে মোট ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ হিসেবে পেয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তান , যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের বরাদ্দ ছিলো ৫০০ কোটি টাকা! এর পরেও ছিলো পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিমে অর্থ পাচার, ২৫ বছরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাচার হয়ে ছিল প্রায় ২৬০ কোটি ডলার!
বাংলা ছিলো পাকিস্তানের কৃষি এবং সম্পদের ভাণ্ডার। এখানেই উৎপন্ন হতো ধান, গম ,পাট, চা, চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য। কিন্তু এগুলো বিদেশে রপ্তানি করে প্রাপ্ত অর্থের প্রায় সবটাই চলে যেতো পশ্চিমের উন্নয়নে।শিল্পক্ষেত্রেও পাকিস্তান পুর্ব বাংলার উপর এতটাই নির্ভরশীল ছিলো যে, শাষকেরা বুঝতে পেরেছিলো_ পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পশ্চিম পাকিস্তান বড় ধরণের বাণিজ্য সঙ্কটে পড়বে কারণ তাদের পণ্যের যে মান তাতে বিকল্প বাজার পেতে সমস্যা হবে। অথচ ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে কিংবা দূর্ভিক্ষের সময় পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের অবস্থা ছিলো ভীষণ করুণ!

শুধুমাত্র অর্থনীতিতেই যে এই বৈষম্য ছিলো , তা কিন্তু নয়; বৈষম্য ছিলো সর্বত্র-ই। কিন্তু এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্য সব ক্ষেত্রেই ধ্বস নেমেছিলো বাংলায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের আগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক গুণ এগিয়ে ছিলো। কিন্তু ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ২৪ বছরের আগের তুলনায় প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা কমে যায়। অথচ পশ্চিমে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা তিনগুণ বেশি হয়ে যায়। চাকরিক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটতো উদ্দ্যেশ্যমূলকভাবে।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাঙালীদের অংশ ছিলো অতি নগণ্য। ১৯৬৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, সচিবালয়ের উচ্চ এবং নিম্ন উভয় পদে মোট কর্মীদের মধ্যে বাঙালী ছিলেন ১৯%। এমনকি স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২২%, দেশরক্ষায় ৮%, আইন মন্ত্রণালয়ে ৩৫% এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মাত্র ১৯% বাঙালি নিযুক্ত ছিলেন। প্রতিরক্ষাক্ষেত্রেও বাঙালীদের যোগদানের সুযোগ ছিলো খুব দুরূহ। সামরিক এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপদে বাঙালি কর্মকর্তা ছিলেন ১৯% আর নিন্ম পদে মাত্র ৯%। সামরিক সরঞ্জামের বেশিরভাগ-ই ছিলো পশ্চিমে, যেসব কেনার জন্য অর্থ যেতো এই পূর্ব বাংলা থেকেই! ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়, যা ১৭ দিন ব্যাপী চলেছিলো। আর এই সময়ে পূ্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিলো! এতেই ধারণা করা যায় যে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য এই পূর্ব অংশ কতটা নগণ্য ছিলো। এছাড়া সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদের উপর ক্রমাগত আঘাত তো ছিলোই, সাথে ছিলো রাজনৈতিক-কূটনৈতিক নানা ঝামেলা করার প্রচেষ্টা।

পশ্চিমা পাকিস্তানীদের কাছে বাঙালি ছিলো ‘ভেতো’ এবং ‘ভীতু’! তাদের ধারণা ছিলো বাঙালিদের লড়াই করার ক্ষমতা নেই। তারা ভাবতেই পারেনি বাঙালি এতোটা গর্জে উঠতে পারে।
২৫ বছরের তীব্র বৈষম্য এবং শোষনের বেড়াজাল ভাঙতেই শুরু হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধ। আর তার পরিণামে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ; এই বাংলার জন্ম হয়েছে নিষ্ঠুর দামের বিনিময়ে, আর্চার কে ব্লাডের মতে_ “The cruel birth of Bangladesh”।

তবে একটা কথা আছে; ”স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু তাকে রক্ষা করা আরো কঠিন”- কথাটি বড় সত্যি। স্বাধীনতার মর্যাদা পরিপূর্ণ রূপে রক্ষা করার জন্য কম কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি। বহুদিন পর্যন্ত এই বাংলাদেশকেই বলা হতো ” তলাবিহীন ঝুড়ি ” বা ” ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস ”। অর্থাৎ সে সময়ে বাংলাদেশকে যতটা সাহায্য করাই হোক , কোনো লাভ হবে না। শুধুই বাংলাদেশের দায় বইতে হবে বড় বড় রাস্ট্রগুলোকে! অবশ্য বলার যে যথেষ্ট কারণ-ও ছিলো; এটা অস্বীকার করা যায় না।

তবে বাংলাদেশকে এই নামে ডাকার কারণ জানার আগে জেনে নেওয়া দরকার “বাস্কেট কেস” অর্থ কি? এই শব্দ দুটি প্রথম ব্যবহার করা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। আহত যেসব সৈনিকের হাত-পা কাটা গিয়েছিল, অপরের কাঁধের বাস্কেটে ছাড়া চলবার কোনো শক্তি ছিল না, তাদের বলা হতো বাস্কেট কেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও আবার ব্যবহৃত হয় শব্দদ্বয়। এরও পরে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বলা শুরু হলো। ১৯৭১ সালে এর ব্যবহার শুরু হয় সদ্য স্বাধীন একটি দেশে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। না,ঠিক স্বাধীনতার পরে নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রায় শেষদিকে এই নাম দেওয়া হয়।

দিনটি ছিলো ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে দক্ষিণ এশিয়া পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের সভায় আলোচনা হচ্ছিল মূলত পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে। সেই বৈঠকে ছিলেন ডেপুটি সেক্রেটারি অব ডিফেন্স ডেভিড প্যাকার্ড, চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল উইলিয়াম ওয়েস্টমোরল্যান্ড, সিআইএর পরিচালক রিচার্ড হেলমস, আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ও জাপানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউ এলেক্সিস জনসন, ইউএসএআইডির উপপ্রশাসক মরিস উইলিয়ামস এবং ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেন।

আলোচনায় মার্চে যে পূর্ব পাকিস্তানে বড় ধরনের খাদ্যসংকট হবে, দুর্ভিক্ষও হবে—এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়েই একপর্যায়ে উইলিয়ামস বলেন যে, মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। উত্তরে জনসন বলেন, সেটা হবে একটা ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস এবং কিসিঞ্জার তাতে সায় দিয়ে এটাও বলেন যে তবে সেটা শুধু তাদের বাস্কেট কেস না।

অর্থাৎ সেই থেকেই বাস্কেট কেস বা তলাবিহীন ঝুড়ি কথাটা বাংলাদেশের হয়ে যায়। অর্থাৎ, দেশটিতে যে সাহায্য দেওয়া হোক, তা ঝুড়ির ফুঁটো দিয়ে পড়ে যাবে, কোনো কাজেই আসবে না।

এরপর থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশকে বলা হতো বাস্কেট কেস। বাংলাদেশের খাদ্যসংকট ও সাহায্য নিয়ে প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ”নিউইয়র্ক টাইমস” ১৯৭২ সালে এক সম্পাদকীয় লিখেছিল, যার শিরোনাম-ই ছিল ‘বাস্কেট’। এমনকি ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েমের পর ৩০ জুন,১৯৭৫ এ একই পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়-র শিরোনাম ছিল,‘ওয়ান ম্যান’স বাস্কেট কেস’।

কিন্তু পালটে গেছে সময়, এসেছে নতুন যুগ, হয়েছে নতুন দ্বারের উন্মোচন। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হয়েছে,এগিয়ে যাচ্ছে অদম্য গতিতে। অর্থনীতির চাকা সবল ও দ্রুত গতিতে ঘুরছে। ২০০৬ সালে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অর্থনীতিতে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ব্যাক্তি ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস বলেছিলেন, ” অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমতা; বাংলাদেশের উন্নয়নের একমাত্র উপায়”। দারিদ্র্য বিমোচন, বাল্য বিবাহ এবং যৌতুক ব্যাবস্থা রোধ, শিশু ও নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নারী-পুরুষ সমতা এবং কর্ম সংস্থানের মতো বিষয়গুলো এতটাই সফলতার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যে বিশ্ব অবাক বিষ্ময়ে আবিষ্ট হয়ে আছে।

এবং ১৯৭১ সালের পর এই বাংলাদেশ এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে, ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিলো আরেকটি রিপোর্ট, যার শিরোনামেই ছিল_‘বাংলাদেশ, “বাস্কেট কেস” নো মোর’।

বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশ নয় যে দেশকে হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন “ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস”। ১৯৭৪ সালের বন্যায় খাদ্য সংকট এবং দুরাবসথা দেখে এই দেশকে “হোপলেস” হিসেবে সীলগালা করে দেওয়া হয়েছিলো, মনে করা হয়েছিলো যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই দেশ আর কোনো দিন-ই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু না, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে জানে। হ্যাঁ, বেশ অনেকটা সময় লেগে গেছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনীতির প্রথম দিকের কাতারে নিয়ে আসতে, কিন্তু,স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলা্দেশ আজ দারিদ্র্য বিমোচনের দৃষ্টান্ত সেই আমেরিকার জন্য-ই!

একদিন যে সংবাদ পত্রিকা বাংলাদেশকে “বাস্কেট” নামে অভিহিত করেছিলো, আজ সেই নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকারই সম্পাদকীয়-র শিরোনাম_ “What can Biden’s plan do for poverty? Look to Bangladesh.” – যে প্রবন্ধটির লেখক দু’-দু’বার পুলিৎজার পুরষ্কার প্রাপ্ত কলামিস্ট ”নিকোলাস ক্রিস্টফ”।

আমেরিকা; বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনি ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর একটি দেশ। অথচ, দেশটির একটি প্রধান সমস্যা – শিশু দারিদ্র্য। এই সমস্যা থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজতে নিকোলাস নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন, বাংলাদেশের উপায় অনুসরন করার!

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ ঘূর্ণঝড়ে ১ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটলে , নিকোলাস বাংলাদেশকে “দূর্ভাগা” বলেছিলেন।আজ তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি-ই ভুল ছিলেন। ওই প্রতিবেদনে তিনি দেখিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, করোনা শুরুর আগে গত চার বছর ধরে প্রতি বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশ, যা চীনের চেয়েও বেশি। গত ১৫ বছরে দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্রের মতো অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে। শুধু তাই না; বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। যা যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির মতো বেশ কিছু অঞ্চলের চেয়ে-ও বেশি। বাংলাদেশের শিশুর পুষ্টিহীনতা ১৯৯১ সালের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা এখন ভারতের চেয়েও কম।

এই সাফল্যের পিছনের রহস্য কি? আমাদের দেশের “নারী এবং শিক্ষা”। আমাদের মতো এই স্বল্পোন্নত দেশকে উন্নয়শীল দেশে পরিণত করার পিছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা আছে এদেশের সর্বোস্তরের নারীদের। দেশের সর্বক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ-ই শুধু বাড়ছে না,তা নয়। এর সাথে বাড়ছে তাদের অবদান-ও। প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বাড়ছে নারীদের অংশ গ্রহন। সেই সাথে বাড়ছে নারীদের চাকরি থেকে ব্যাবসাক্ষেত্র অবধি নারীদের অদম্য পথচলা। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর শিক্ষা বাংলাদেশকে এগিয়ে দিয়েছে।তারাই হয়ে ঊঠলো বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত।দেশের তৈরি পোশাক খাত নারীদের কাজের বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। চিনের পর সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এখন বাংলাদেশ-ই। আবার,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে নারীর সংখ্যা হিসেবে ৫৪টি স্বল্প আয়ের দেশের মধ্যে ৬ নম্বরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বর্তমান জিডিপিতে নারীর ভূমিকা ২০ শতাংশ।অবশ্য এটি একজন নারী বছরে যত কাজ করেন, তার মাত্র ১৩ থেকে ২২ শতাংশের হিসাব। বাকি ৭৮ থেকে ৮৭ শতাংশ কাজের বিনিময়ে কোনো মূল্য পান না তারা। তাই ওই কাজের হিসাব জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। কিন্তু ওই ২০%-ও এখন সমহারে বাড়ছে।

বর্তমান এই করোনাকালীন সময়ে , এই পেন্ডামিক অবস্থায় পুরো বিশ্ব যখন স্থবির, তখন এই বাংলাদেশের নারীরাই সচল রেখেছে দেশের আয় এবং উৎপাদনকে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলো থেকে-ও নারীরা উঠে আসছেন। লকডাউনেও ঘরে বসেই নিজেদের হোম বিজনেস গড়ে তুলেছেন, স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলার পাশাপশি যেমন নিজেদের পরিবারকে সাহায্য করেছেন, তেমনি বড় ভূমিকা রাখছেন দেশের অর্থনৈতিক খাতে-ও।
অর্থাৎ ,বাংলাদেশ মূলত তার সবচেয়ে অব্যবহৃত সম্পদকেই বিনিয়োগ করতে পেরেছে- আর সেটা হচ্ছে আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যারা ছিলো সবচেয়ে প্রান্তিক, সবচেয়ে কম উৎপাদনক্ষম; আর এখন সেখান থেকেই অর্থনীতি চলমান থাকছে ,সেখান থেকেই আসছে সবচেয়ে বেশি সুফল।

তাই, আমেরিকান বিলিয়নিয়ারদের নিংড়ে আর খুব বেশি একটি উৎপাদনশীলতা বের করে আনতে পারবেন না বাইডেন। কিন্তু সেইসব আমেরিকান শিশুদের তৈরি করতে পারে যারা তাদের হাই স্কুলের গন্ডি পার করতে পারেনি। আর সে সংখ্যা কিন্তু কম নয়।বাংলাদেশ যেমন দেশের প্রান্তিক জনপদকে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠেছে উন্নত থেকে উন্নততর, তেমনি যদি আমেরিকার প্রধানমন্ত্রী জো বাইডেন শিশু দারিদ্র্য বিমোচনে এই একই পদ্ধতি বা দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন, তাতে লাভ বৈ ক্ষতি হবে না।

বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে, ” We, Bangladesh,are no more, ‘Basket case’.”

আজ স্বাধীনতার ৫০ তম বর্ষে পদার্পণ করেছি আমরা।স্বাধীনতার ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষ্যে বিশ্বের ৫০টি দেশ একযোগে পালন করতে চলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমরা সেই নির্মম ইতিহাসকে ফেলে এসেছি অনেক পিছনে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি সোনার বাংলার সেই স্বপ্নের পথে। একদিন আসবে যেদিন এই বাংলায় থাকবে না কোনো দুঃখ, কোনো ক্লেশ। একদিন এই বাংলা ধন-ধান্যে পূর্ণ হয়ে উঠবে।শুধু আমেরিকা নয় ,শুধু নির্ধারিত কোনো বিষয়ে নয়- একদিন এই বাংলাদেশ হয়ে উঠবে গোটা বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোলমডেল।

স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে শ্র্দ্ধা সকল সাহসী, অদম্য বাংলার সন্তানদের। ওঁরা ওঁদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে গেছেন; এবার আমাদের পালা। সময় এসেছে এই বাংলার মাটিকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়ার, যে আশায় বুক বেঁধে আমাদের সোনার সন্তানেরা রক্ত দিয়ে, নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে দিয়ে মুক্ত করে গেছেন এই দেশকে। তাঁদের আশা পূরন করতে হবে এবার। মিলিত কন্ঠে আবারও আজ বলার সময় এসেছে_” হে আমার বাংলা মা! এই মাটিতে জন্ম আমার, এই বাংলা আমার মা, এই বাংলা-ই আমার অহংকার। ও আমার দেশের মাটি,তোমার ‘পরে-ই ঠেকাই মাথা।।”

Read Entire Article