রহস্যময় জোকারের হাসি ঠোঁটে এঁকে রাখেন এই নারীরা

2 weeks ago 9

আইনু আদিবাসী নারীরা অদ্ভুত এই ট্যাটু আঁকতেন ঠোঁটে

আইনু আদিবাসী নারীরা অদ্ভুত এই ট্যাটু আঁকতেন ঠোঁটে

আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় মানুষের রুচি, ফ্যাশন, জীবনযাত্রা। আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে একটি জিনিস খুবভালোভাবে যুক্ত হয়েছে। সেটি হচ্ছে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উল্কা আঁকা। যাকে সংক্ষেপে বা এক কথায় ট্যাটু বলা যায়। দেশ, পরিবেশ, স্থান এবং মানুষের রুচিভেদে ট্যাটুর ভিন্নতা দেখা দেয়।

বর্তমানে এই ট্যাটু বিশ্বব্যাপী অনেক জনপ্রিয়। অনেকের বেলায় তো ট্যাটু প্রীতি এতো বেশি দেখা যায় যে, পুরো শরীর অনেকে ঢেকে ফেলে ট্যাটুতে। তবে ট্যাটু আধুনিক ফ্যাশনের অংশ হলেও এর প্রচলন হাজার হাজার বছর আগে থেকে। 

যদিও সেসময় এটিকে ফ্যাশনের অংশ মনে করা হতো না। এর পেছনে ছিল কুসংস্কার আর কিছু বানানো রীতি। প্রাচীন চীনে একটি প্রচলন ছিল। তারা নিজেদের ভ্রু তুলে সেখানে রং দিয়ে এঁকে ভ্রু তৈরি করত। চীনা অধিবাসীদের মাঝে বেশ সাধারণ ও জনপ্রিয় একটি বিষয় ছিল।

তাদের এই সব ভ্রুর কারুকার্য ছিল অনেকটা আজব, হয় একেবারেই গোলগোল বা অস্বাভাবিক রকমের সোজা। এই কারুকার্যগুলোর আবার ছিল নানা ধরনের নাম, যেমন- ফারঅ্যাওয়ে হিলস্‌ (দূরবর্তী পাহাড়), উইলোজ লিভস্‌ (ক্রিকেট ব্যাটের পাতা) ও মথস্‌ অ্যান্টেনাস্‌ (পোকার শুঁয়ো)। এছাড়াও এখনকার মতোই ভ্রুর ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলও জনপ্রিয় ছিল। 

জাপানের প্রাচীন এক আদিবাসী আইনু। রহস্যময়ী আইনু গোষ্ঠীর বসবাস ছিল জাপানের দ্বীপে এবং রাশিয়ার কিছু কিছু অংশজুড়ে। এদের বাস আজ থেকে প্রায় ১২ হাজার বছর আগে কিংবা এরও আগে। আইনু অর্থ তাদের মতে, ঈশ্বরের বিশ্বাসী। এরা উপাসনা করত ভাল্লুক, তিমি এবং পেঁচাকে। সেখানেও ছিল কিছু নিয়ম। শুধু মাত্র বাদামী রঙের ভাল্লুক, ঘাতক তিমি এবং শিংযুক্ত পেঁচাকেই তারা উপাসনা করত।

এই রহস্যময় জাতিটির উৎপত্তির ব্যাপারে খুব কমই জানা যায়। এরা কোথা থেকে এসেছিল এবং কবে এসেছিল এই এলাকায় তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে আইনু জাতি ছিল পর্তুগিজদের একটি অংশ। সেখান থেকে রাশিয়া হয়ে জাপানে এসেছিল এরা। পরবর্তীতে এরা পশ্চিম ইউরোপে ইয়েজো নামে পরিচিত ছিল। জাপানের যেই অঞ্চলটিতে আইনুরা বসবাস করত যেখানকার নামও তাদের নামানুসারেই হয়।   

এই গোষ্ঠীর নারীরা মুখে এক ধরনের ট্যাটু বানাতো, যা দেখতে ছিল অনেকটা সঙ বা জোকারের হাসির মতো। আইনু গোষ্ঠীর মানুষদের বিশ্বাস ছিল, এই ট্যাটুগুলো তাদের নারীদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এমনকি অসুস্থতা, বন্ধ্যাত্ব এবং বাচ্চা প্রসবের সময় যেসব জটিলতা দেখা যায়, সেগুলো থেকেও রেহাই দেবে। শুধু তা-ই নয়, মৃত্যু পরবর্তী জগতেও এই ট্যাটু রীতি শান্তি আনতে পারে বলে তাদের ধারণা ছিল।

এই ট্যাটু আঁকার প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন ধাপে বিভক্ত ছিল যা শুরু করা হতো ৭ বছর বয়স থেকে। খুব কঠিন ছিল সেই প্রক্রিয়া। সরাসরি চামড়ার উপর রেজার বা খুর দিয়ে করা হত উল্কি। এরপর কাঠের পোড়ানো গরম ছাই লাগিয়ে দেয়া হত রক্ত বন্ধ করার জন্য। এটাকে তারা ব্যবহার করত এন্টিসেপটিক হিসেবে। কিছুদিন পরপরই এই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করত। যা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। অদ্ভুত দেখতে এই ট্যাটু। যে নারীর উল্কি যত বেশি উজ্জ্বল পাত্রী হিসেবে তার কদর ততই বেশি।  

১৭৯৯ সালের প্রথম দিকে, এডো পিরিয়ডের সময়, আইনুদের এই উল্কির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে খুব একটা এই নিষেধাজ্ঞা মানত না তারা। পরবর্তীতে ১৮৭১ সালে হক্কাইডো ডেভেলপমেন্ট মিশন ঘোষণা করে যে, আজকের দিনের পরে যারা জন্মগ্রহণ করবে তাদের উল্কি আঁকা থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। এমনকি যারা এই  আইন মানবে না, তাদের জন্যও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। এতে করে ধীরে ধীরে উল্কি আঁকা বন্ধ হতে থাকে। 

তবে এতে করে আইনু আদিবাসীদের মধ্যে তৈরি হয় আরেক কুসংস্কার। যে যারা উল্কি আঁকা থেকে বিরত থাকল তারা ঈশ্বরের কাছে গ্রহণযোগ্য না। তাই সেই নারীরা কখনো বিয়ে করতে পারবে না। এজন্য লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক নারী তাদের ঠোঁটের উল্কি আঁকতেন। সরকারের পক্ষ থেকে যখন টহলে আসত তখন মায়েরা তাদের মেয়েদের লুকিয়ে রাখত। 

১৯ শতকের শেষদিকে এসে আইনুরা এই উল্কির আরো প্রসার ঘটায়। এবার ঠোঁট ছাড়াও গালে হাতে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উল্কি করতে শুরু করে। হাতে রেখা এবং জ্যামিতিক আকারের কিছু উল্কি আঁকা থাকত তাদের। যারা মারা যেতেন তাদের সমাধিতেও এঁকে দেয়া হত এমন বিভিন্ন ধরনের আকৃতি। এরপর ধীরে ধীরে এই উল্কি আঁকার রীতি আইনুদের থেকে বিলুপ্তি হতে থাকে। আধুনিকতার সঙ্গে গা ভাসিয়ে অনেক আইনুরাই এসেছেন সভ্যতার আলোতে। বিংশ শতাব্দীতে এসে হাজার হাজার বছর আগের এই রীতি এখন শুধুই ইতিহাস। তবে এখনো যারা সেই অঞ্চলটিতে বসবাস করেন তাদের কেউ কেউ মুখে উল্কি এঁকে রাখেন। 

View Source