মহাকাশ থেকেও দেখা যায় ম্যারি ম্যান চিত্র, কারা বানিয়েছিল এটি!

1 month ago 24

অস্ট্রেলিয়ার ম্যারি ম্যান চিত্রটি

অস্ট্রেলিয়ার ম্যারি ম্যান চিত্রটি

কয়েক দশক ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেশ কিছু গুহাচিত্র আবিষ্কার করেছে। যেগুলো আধুনিক সভ্যতাকে মুখোমুখি করেছে অতীতের। এসব গুহাচিত্র হাজার হাজার বছর পর জানান দিচ্ছে সেই সময়কার জীবনযাত্রা, আচার, সংস্কৃতি। হাজার বছর আগে মানুষ কতখানি সভ্য ছিল, কীভাবে তাদের দিনাতিপাত করত তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এখান থেকেই। এমনই এক মানব চিত্র ধরা পরে ১৯৯৮ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে।

২৬ জুন ১৯৯৮ সাল, ট্রেস স্মিথ নামে একজন অস্ট্রেলীয় বিমান চালক একটি চাটার্ড বিমান নিয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন। সেসময় তিনি ভূমিপৃষ্ঠের ওপর খোদাই করা এই চিত্র শিল্পটি প্রথম দেখতে পান। যদিও পরবর্তীকালে নাসার পক্ষ থেকে দুটি স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ করা হয়, তাতে দেখা যাচ্ছে ২৭ মে ১৯৯৮ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে ওই অঞ্চলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তবে ১২ জুন ১৯৯৮ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে মারি ম্যানের উপস্থিতি পরিষ্কার। অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ২৭ মে থেকে ১২ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে এই শিল্পকর্মটি তৈরি করা হয়েছে।

১৯৯৮ সালে এক পাইলটের নজরে আসে এই চিত্রটি তবে কারা, কেন এবং কীভাবে এই মানুষের চিত্রটি একেছিল তা আজো অজানা। ২.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪ কিলোমিটার প্রস্থ সমন্বিত ১ ফুট গভীরতার লাইন খনন করে বিপুল আকৃতির এই মারি ম্যান এঁকেছিল কেউ। সবচেয়ে আশ্চর্যের হল এই বিশাল আকৃতির শিল্পকর্মটি গড়ে তুলতে গেলে জিপিএস ব্যবস্থার মতো কোনো কিছুর সহায়তা দরকার। অথচ তখন সদ্য জিপিএস সিস্টেম আবিষ্কার হয়েছে। গবেষকদের রীতিমতো এই চিত্রকর্মটি ঘাম ঝরিয়েছে। এখনো এর সমাধান খুঁজে পাননি কেউ। 

গবেষকদের মতে, যে বা যারাই এই শিল্পকর্মটি গড়ে তুলুন না কেন, তাদের কৃতিত্ব যে বিপুল পরিমাণ। তা অস্বীকার করার সুযোগই নেই! শিল্পকর্মটির খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে বেশ কিছু অজানা সূত্র থেকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফ্যাক্স আসে। সেই ফ্যাক্স বার্তাগুলো বিশ্লেষণ করে অনেকেই মনে করেছেন এটি আমেরিকানদের কাজ। যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এত বড় চিত্রকর্মটি আঁকা হল, আর কেউ দেখলোই না! এটা কীভাবে সম্ভব? 

নাসার স্যাটেলাইট চিত্রে এভাবেই দেখা যায় ম্যারি ম্যানকেশিল্পের কদর বিংশ শতাব্দীতে এসে কেউ বুঝুক আর না বুঝুক। হাজার হাজার বছর আগে এটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা আন্দাজ করাই যায়। ওই সময় তারা এঁকেছিল মানুষ, পশুপাখি, নানান আকৃতির জ্যামিতিক নকশা। তবে এগুলো সুদক্ষ কোনো কারিগর ছাড়া আঁকা সম্ভব না। অতীতে আঁকার ঘটনা একটা ঘটেনি। হাজার হাজার নিদর্শন রয়েছে। তবে এই চিত্রকর্মের সময়কাল হাজার বছর হয়নি। এমনটাই দাবি গবেষকদের। তারা বলছেন এই শিল্পকর্মটির বয়স ২২ বছরের বেশি নয়! আরও নির্দিষ্ট করে বললে সাড়ে বাইশ বছর! 

এই ধরনের কোনো কিছু দিয়েই পাথরের গায়ে এই চিত্র আঁকা হয়েছিল বলে ধারণা স্থানীয়দের এর অবস্থান করছে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রদেশ দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের মরু অঞ্চলের ছোট্ট শহর মারি থেকে ৬০ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে। এই শিল্পকর্মটি আসলেই এক দৈত্যাকৃতি মানুষের চিত্রকলা খোদাই শিল্প! এটি নিকটবর্তী শহরের নামানুসারে ‘মারি ম্যান’ নামে বিখ্যাত। মারি ম্যান হল হাতে লাঠি সহ এক দীর্ঘাকৃতি পুরুষের চিত্র। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া প্রদেশের মরু অঞ্চলের আদিবাসী আরবানা সম্প্রদায়ের কোনো মানুষের অবয়ব এটি। তার হাতে থাকা লাঠিটি হল ‘উমেরা’। এই অঞ্চলের এক বিশেষ ধরনের লাঠি দিয়ে ছোট ছোট পাখি শিকার করা হয়, তাকেই বলা হয় উমেরা। আবার অনেকে মনে করেন হাতের ওই জিনিসটি আসলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিখ্যাত আত্মরক্ষার অস্ত্র ‘বুমেরাং’। 

এমন আরো অনেক চিত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন জায়গায়, যার রহস্য ভেদ করা যায়নি যুগ পেরিয়েও অনেকে দাবি করেন মারি ম্যান আসলে ‘আর্টেমেসন জিউসের’ প্রতিচ্ছবি। আর্টেমেসন জিউস হল প্রাচীন গ্রীসে তৈরি দেবতাদের রাজা জিউসের এক বিশেষ ব্রোঞ্জ মূর্তি। এটি ১৯২৮ সালে ভূমধ্য সাগরের তলদেশ থেকে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে স্থানীয় আরবানা অ্যাবরজিনাল আদিবাসী সম্প্রদায়ের দাবি এটি তাদের সম্প্রদায়ের একজন বলিষ্ঠ মানুষের প্রতিচ্ছবি আঁকা হয়েছে। যদিও মারি ম্যান আবিষ্কার হ‌ওয়ার প্রথম দিকে এই আদিবাসি সম্প্রদায়টি খুশি হয়নি। তারা মনে করেছিল তাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার জন্য‌ই এই শিল্পকর্মটি আঁকা হয়েছে। 

অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের মরু অঞ্চলের ছোট্ট শহর মারিতে এর অবস্থান সেইসঙ্গে এই আদিবাসী গোষ্ঠীটি ওই অঞ্চলে বাইরের জনসাধারণের প্রবেশ মন থেকে মেনে নিতে পারে না। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল এরকম একটি বিশালাকৃতির শিল্পকর্ম আবিষ্কৃত হ‌ওয়ায় ওই অঞ্চলে বাইরের মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। আরবানাদের এই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই অস্ট্রেলীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বাইরের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও আকাশপথে মারি ম্যান দর্শনের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তার ফলে আকাশ পথে মারি ম্যান দর্শনকে ঘিরে ওই অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিস্তার ঘটে।

আধুনিক প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কারা, কীভাবে এঁকেছিল এই বিশালাকৃতির ছবি!ঘটনা হল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের মরু অঞ্চল এতটাই জনবিরল যে সেখানে একদল মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে কোনো কার্যকলাপ চালালে তা প্রশাসনের নজরে না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। ২০১৩ সালের পর প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারনে মারি ম্যান প্রায় মুছে যায়। ২০১৬ সালে সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষের অনুমতিক্রমে সংস্কার কাজ চালিয়ে এটিকে আবার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

Read Entire Article