ভূ-গর্ভস্থ জাদুঘরে শোনা স্বাধীনতার কথা

4 months ago 64

 ডেইলি বাংলাদেশ

স্বাধীনতা জাদুঘরের একাংশ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একই সমান্তরালে জ্বলছে ‘শিখা চিরন্তন’, পাশেই উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। মাথাটা একটু উঁচু করলেই দেখা মেলে স্বাধীনতা স্তম্ভের। দৃঢ় আলোক স্তম্ভটির পদতলিতে দুটি দরজা। সেগুলো পেরেলোই পৌঁছে যাবেন ভিন্ন এক আবহে। খুঁজে পাবেন একাত্তরের স্বাধীনতার গন্ধ। দেখতে পাবেন মুঘল আমল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর্যন্ত বাঙালি জাতির ইতিহাসের দৃশ্যপট।

একমাত্র ভূ-গর্ভস্থ জাদুঘর

বলা হচ্ছে স্বাধীনতা জাদুঘরের কথা। এই জাদুঘরটি মানুষকে বলে স্বাধীনতার কথা। স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্ম-ইতিহাসের সাক্ষীগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে এই জাদুঘর। এটিই দেশের সর্বপ্রথম এবং একমাত্র ভূ-গর্ভস্থ জাদুঘর।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টেরাকোটা ম্যুরালের নিচে ভূ-গর্ভে এ জাদুঘরের অবস্থান। ম্যুরালের নিচে কিছুটা পথ হেঁটে গেলেই জাদুঘরের প্রবেশদ্বার। যেখানে চুপচাপ বসে আছে স্বাধীনতা জাদুঘর; সেখানেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। এমনকি এই জায়গাতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল।

নকশার জন্য শুরু হয় প্রতিযোগিতা

১৯৯৭ সাল। পাবলিক ওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (পিডব্লিউডি) ‘স্বাধীনতা জাদুঘর ও স্তম্ভ কমপ্লেক্স’ তৈরির একটি নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ঠিক করা হয় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মিত হবে। সেই প্রতিযোগিতায় অসংখ্য স্থপতি অংশ নেন। অংশ নেন বুয়েট থেকে সদ্য পাশ করা আরবানার মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরীও। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় মেরিনা-কাশেফের নকশা। পরের বছর পিডাব্লিউডি স্বাধীনতা জাদুঘর স্তম্ভ নির্মাণের জন্য কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগপত্র দেয় আরবানাকে। প্রায় ৬৭ একর জায়গা ওপর নির্মিত স্বাধীনতা স্তম্ভটি তৈরিতে ব্যয় হয় ১৭৫ কোটি টাকা।

স্বাধীনতা জাদুঘর ও স্তম্ভ কমপ্লেক্সের নকশা নিয়ে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম বলেন, স্বাধীনতা স্তম্ভ মানেই দেশের প্রতীক। তাই অনেক খাটুনি আর চিন্তা-ভাবনা করেই এটার নকশা করি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো খোলামেলা জায়গায় স্থাপনা কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়েছিল। কিন্তু সংসদ ভবন সেই ভাবনাটা অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল। তাই ওই ভবনের স্থাপত্যশৈলী ছিল আমাদের প্রেরণা। আমরা এমন একটি নকশা করি যেটার মধ্যে টাইমলেসনেস আছে। নকশাটি এতই আধুনিক যে, মনে হয় সব সময়ের।

 সংগৃহীত

লেগেছে ১৬ বছর

অনেক সময় গড়িয়েছে কাজ শুরুর সময় থেকে। স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে ১৬ বছর। একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার, ৩টি জলাধার, শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা সংগ্রামের চিত্রবিশিষ্ট্য একটি ম্যুরাল ও ১৫৫ আসন বিশিষ্ট একটি অডিটোরিয়ামের পরিকল্পনা নিয়ে কমপ্লেক্সের কাজ পুরোদমে শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।

স্বাধীনতা জাদুঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্যশৈলী। পাতালে অবস্থিত জাদুঘরটির বিশাল এলাকাজুড়ে ফাঁকা জায়গা। প্লাজা চত্বরে টেরাকোটা ম্যুরালের নিচের অংশে এ জাদুঘরের অবস্থান। ওপর থেকে নিচে প্রসারিত হয়েছে জাদুঘরের প্রবেশপথ। প্রবেশের সময় রঙিন কাচের ভেতর থেকে আসা হালকা সবুজ আলো দেখে মনে হবে যেন কোনো গহিন সুড়ঙ্গ পথে যাওয়া হচ্ছে। পুরো জায়গাজুড়েই স্থানে স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ের ছবি। জাদুঘরের মাঝখানে রয়েছে একটি ফোয়ারা। নাম দেয়া হয়েছে ‘ওয়াটার ফল’। এটি নেমে এসেছে মাটির উপরিভাগ থেকে।

জাদুঘরের তিন অংশ

১৪৪টি প্যানেলে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতিসত্তার স্বাধীনতার ইতিহাস আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। আলোকচিত্রের মধ্যে রয়েছে মুঘল আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ের ছবি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ছবি। তবে এসব আলোকচিত্রকে ৩টি অংশে বিভক্ত করেছে স্বাধীনতা জাদুঘর।

প্রথম অংশে আছে বাংলা ভাষার উত্পত্তি, বাংলার উত্পত্তি ও স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন সময়কার আন্দোলন। এটি শেষ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ছবি দিয়ে।

দ্বিতীয় অংশটি একটি অন্ধকার কুঠুরি। সেখানে রয়েছে একাত্তরের ভয়াবহ দিনগুলোর ছবি। এই কুঠুরির নাম দেয়া হয়েছে ‘কালো অধ্যায়’। তৃতীয় অংশটি লড়াই, সংগ্রাম ও বিজয়ের। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অপারেশন, আন্তর্জাতিক সাড়া ইত্যাদি। এটি শেষ হয়েছে বাঙালির বিজয় অর্জনের ছবির মধ্য দিয়ে।

 সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা বলে...

২০১৫ সালের ২৬ মার্চ জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এই জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছে দেশ ও জাতির গৌরবময় ইতিহাস আর সংগ্রামের ছবি। জাদুঘরের প্রবেশদ্বার দিয়ে কয়েক পা বাড়ালেই প্রথমে চোখে পড়বে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশাল ছবি। শুরুতে সেই ছবিটি দৃষ্টিনন্দিত হলেও জাদুঘরের প্রদর্শন শুরু হয় বাংলা শিলালিপির উত্পত্তি ও তার বিবর্তনের ছবি দিয়ে। ফাঁসির দড়িতে ঝোলানোর পূর্ব মুহূর্তে কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর সেই দুর্লভ ছবিও চোখে পড়ে এই জাদুঘরে এলে। কী নেই এই জাদুঘরে? বাংলাদেশে নীল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের ছবিও আছে এই জাদুঘরে।

ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ঘটা ২৫ মার্চ কালোরাতের কথা মনে করিয়ে দেয় এই জাদুঘরের প্রদর্শিত ছবিগুলো। ১৯৭১ সালের ২২ জুন সংগ্রাম পত্রিকায় জামায়াত নেতা গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা-ও রয়েছে ছবি আকারে। আছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের ছবি। মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্র ও যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিও আছে এখানে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পূর্বে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, মিত্রবাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে কলম চেয়ে নিচ্ছেন, সেই ছবি ও আত্মসমর্পণের ছবি। যে টেবিলের ওপর লে. জে. আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন তার অনুকৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এ জাদুঘরে। তবে মূল টেবিলটি প্রদর্শন করা হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরের মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে। বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি ও স্বাধীনতার সপক্ষে বহির্বিশ্বে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পুস্তিকার ছবিও রয়েছে এতে।

স্বাধীনতা জাদুঘরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সৈয়দ এহসানুল হক জানান, করোনাকালে জাদুঘর বন্ধ রয়েছে। তবে অন্যান্য সময়ে প্রতি শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০ টাকা এবং ১২ বছরের কমবয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশমূল্য ২ টাকা। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। এছাড়া সরকারি ছুটির দিন জাদুঘরটি বন্ধ থাকে।

ঢাকা শহরের মাঝেই ঘুরে বেড়ানো আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে স্বাধীনতা জাদুঘর হতে পারে যে কারো গন্তব্য। ছোট থেকে বড়—সবারই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও এর পেছনের গল্পগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে পারে একদিনের এই স্বাধীনতা জাদুঘর কমপ্লেক্স সফর!

Read Entire Article