নবদিগন্তে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিমাখা গ্রাম

2 weeks ago 15

 ডেইলি বাংলাদেশ

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তার গ্রামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রান্তর জুড়ে প্রকৃতির লিলাখেলা। ক্ষেতের বুক চিরে রয়েছে আঁকাবাকা পাকা সড়ক। সড়কের আশপাশে উন্নয়নের ছোঁয়া। চোখের পড়ে নানা শহুরের মতো স্থাপনা। এ যেন উন্নয়নের নবদিগন্তে পৌঁছেছে সবুজ একটি গ্রাম। এ গ্রামটিতেই শতশত স্মৃতি রঙিন করেছেন দেশের সূর্যসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। সরকারের নানা পদক্ষেপেই বীরের স্মৃতিমাখা অতীতের খোর্দ্দ খালিশপুর এখন নবদিগন্তের হামিদনগর।

ঝিনাইদহ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে মহেশপুর উপজেলায় অবস্থিত হামিদনগর। সেখানেই কাটে বাংলাদেশের সূর্যসন্তান হামিদুর রহমানের শৈশব-কৈশোর। এ সূর্যসন্তানের সম্মানে গ্রামটি এখন নবরূপ পেয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এ বীরের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে গ্রামটিতে করা হয়েছে স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাদুঘর ও লাইব্রেরি।বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি রক্ষার্থে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে

রাস্তাঘাট মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে দিয়েছে। গ্রামের মানুষের শিক্ষাকে সহজ করেছে স্থাপিত স্কুল-কলেজ। যার ফলে দূরদূরান্তে বা শহরে গিয়ে শিক্ষা অর্জনের প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয় না বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিমাখা গ্রামসহ আশপাশের শিক্ষার্থীদের। 

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে সরকারি কলেজে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে দেশসেবায় তারা নানাভাবে অবদান রাখছে তারা। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর দরিদ্রতার কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তার ত্যাগের বিনিময়ে শুধু স্বাধীন বাংলাদেশ নয়, তার স্মৃতিমাখা গ্রামও আজ নবদিগন্তের দিকে ছুটে যাচ্ছে।

খোর্দ্দ খালিশপুর থেকে হামিদনগর 

খোর্দ্দ খালিশপুর ছিল মহেশপুর উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রামটি ছিল বেশ অপরিচিত। স্বাধীনতার পর গ্রামটি সারাদেশে বেশ পরিচিতি পায়। একজন বীরকে ধারণ করা গ্রামটি সবার কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠে। তার গ্রামের বাড়ি দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ বীরের স্মৃতি রক্ষার্থে সেই খোর্দ্দ খালিশপুরের নামও পরিবর্তন করা হয়। সেই গ্রামটির নাম হয় হামিদনগর।

যেভাবে আছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবার

১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চরপাড়া থানার ডুমুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তাদের পরিবার ঝিনাইদহের মহেশপুরের খোর্দ্দ খালিশপুর (বর্তমান হামিদনগর) গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তার বাবা আক্কাস আলী, মা কাইদাছুন নেছা। হামিদুর রহমানরা ৪ ভাই ও ৩ বোন।

অপর ভাইয়েরা হলেন-হামজুর রহমান, শুকুর আলী, ফজুলুর রহমান। বর্তমানে তাদের মেঝ ভাই হামজুর রহমান জীবিত রয়েছেন। তবে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত। বোনদের মধ্যে আছিয়া খাতুন ও রিজিয়া খাতুন জীবিত আছেন ও রাবেয়া খাতুন মারা গেছেন।

চারতলা বাড়ি পাচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবার

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের জন্য ১৯৮১ সালে একটি বাড়ি বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বাড়িটি ধসে পড়েছিল। এখন সেই বাড়িটি চারতলা করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য বাড়িটির একতলা সম্পন্ন হচ্ছে। বাকি ভবনের তলার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। 

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের জন্য নির্মাণাধীন চারতলা বাড়ি

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একমাত্র জীবিত ভাই হামজুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের জন্য নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে। এ ভবন পেয়ে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের সবাই খুশী। সবাই এখানে থাকতে পারবে।

হামজুর রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মিলন বলেন, আমাদের পরিবার ও স্বজনেরা প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা সম্মানি পাচ্ছে। এতে সংসার ভালোভাবে চলছে। সরকার আমাদের প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছে তাতে আমরা আনন্দিত।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে ভারতে প্রশিক্ষণ নেন। তারপর তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন হামিদুর রহমান। হামিদুর রহমান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের দক্ষিণ-পূর্বে কমলগঞ্জের ধলই নামক স্থানে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। ২৮ অক্টোবর রাতে ধলইয়ের যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন করে শত্রুর গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন তিনি।

দাফন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

শাহাদাতবরণের পর হামিদুর রহমানকে ধলই থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত আমবাসা গ্রামে দাফন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকার জন্য তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন। পরে তার দেহবশেষ বাংলাদেশে আনা হয়। ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত হন তিনি।

View Source