দেশের বাইরেও খ্যাতি ছড়িয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘মেজবান’ 

1 week ago 7

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানের আয়োজন করে চট্টগ্রামে রাউজান থানা আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানের আয়োজন করে চট্টগ্রামে রাউজান থানা আওয়ামী লীগ।

‘মেজবান’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ হলো নিমন্ত্রণকর্তা। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান মেজবান। চট্টগ্রামের ভাষায় এটিকে ‘মেজ্জান’ বলা হয়। ধারণা করা হয়, ১৫শ’ ও ১৬শ’ শতাব্দীর প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে পাওয়া মেজোয়ানি ও মেজমান শব্দ দুটি থেকেই মেজবান শব্দের উৎপত্তি। এখানে মেজোয়ানি অর্থ আপ্যায়নকারী ও মেজমান অর্থ আপ্যায়ন। 

মেজবানের নাম শুনলে জিভে জল আসে না, এমন লোকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। তবে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেজবানের আপ্যায়ন ব্যবস্থায় বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সে সময় মাটিতে চাটাই কিংবা পাটি বিছিয়ে ও মাটির সানকিতে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো। বর্তমানে চাটাই কিংবা পাটি কোনোটিরই ব্যবহার আর চোখে পড়ে না। দেখা যায় না মাটির সানকিও। এখন চেয়ার-টেবিল ও প্রচলিত থালায় অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। 

 চট্টগ্রামের দক্ষ বাবুর্চিরাই মেজবানে রান্নার কাজটি করে থাকেন।

চট্টগ্রামে সাধারণত দুটি কারণে মেজবানের আয়োজন করা হয়। একটি হলো সুখ বা আনন্দ উপলক্ষে। অপরটি হলো শোকে। সুখ বা আনন্দ বলতে শিশুর জন্মের পর আকিকা, জন্মদিন, ব্যক্তিগত সাফল্য, নতুন ব্যবসা শুরু, নতুন বাড়ি তৈরি, বিয়ে, খৎনাসহ বিভিন্ন উপলক্ষে মেজবানের আয়োজন করে থাকেন অনেকেই। এছাড়া কারো মৃত্যুর পর কুলখানি, মৃত্যুবার্ষিকীতেও সাওয়াবের উদ্দেশ্যে মেজবানের আয়োজন করা হয়। 

চট্টগ্রামের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে অতিথিদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ অনেকটা নির্ধারিত থাকলেও মেজবানে তা থাকে না। ফলে মেজবানের খাবার পরিবেশন ব্যবস্থাকে চট্টগ্রামের ভাষায় ‘ঢালা খানা’ বলা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে সকাল থেকে শুরু হয়ে মেজবানের অনুষ্ঠান চলে দুপুর পর্যন্ত। তবে বর্তমান সময়ে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্তও এ ভোজন অনুষ্ঠান চলতে দেখা যায়। এ খাবার সবার জন্য উন্মুক্ত। এতে দাওয়াত ছাড়াও অংশ নেন অনেকেই। 

চট্টগ্রামের দক্ষ বাবুর্চিরাই মেজবানে রান্নার কাজটি করে থাকেন।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা মেজবানের আয়োজন করলে লোকের মাধ্যমে সেই ভোজের দাওয়াত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগেকার সময়ে মেজবানের দাওয়াত দেয়া হতো ঢোল পিটিয়ে। মেজবানের রান্নার রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব। এর মূল খাবারের তালিকায় থাকে গরুর মাংস ও সাদা ভাত। সঙ্গে থাকে ছোলার ডাল ও গরুর পায়ের হাড়ের ঝোল (চট্টগ্রামের ভাষায় নলার ঝোল)। তবে মেজবানে গরুর মাংসের রান্না হয় ভিন্ন ধরনে। ব্যবহৃত হয় ভিন্ন মসলাও। 

চট্টগ্রামের দক্ষ বাবুর্চিরাই মেজবানে রান্নার কাজটি করে থাকেন। এ রান্নায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মসলার পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় চট্টগ্রামের হাটহাজারী অঞ্চলের শুকনো লাল মরিচ। যা খাবারের স্বাদকে করে তোলে অতুলনীয়। অন্যান্য মরিচের তুলনায় এ মরিচের দামও বেশি। বিশেষ করে মেজবানের অনুষ্ঠানের চাহিদাকে কেন্দ্র করে এটির দামে হেরফের ঘটে। 

অপরদিকে, আদিকাল থেকেই গরুর মাংসের জন্য প্রসিদ্ধ চট্টগ্রাম। এখানকার লাল গরু সবচেয়ে উন্নত দেশি গরুর জাত। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এ গরু উৎপাদন হয় বেশি। আকারে ছোট হলেও দেখতে সুন্দর এ গরুর মাংস বেশ সুস্বাদু। মেজবানে এ গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। একটি কথা বেশ প্রচলিত আছে, সারা দেশে একদিনে যে পরিমাণ গরু জবাই হয়, চট্টগ্রামে ঠিক সমপরিমাণ গরু জবাই হয়। 

চট্টগ্রামের কয়েকজন ইতিহাসবিদের মতে, শতবর্ষের পরিক্রমায় মেজবান শব্দের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সময়ে এর মানে হচ্ছে, বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আপ্যায়নের ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ধনী কিংবা গরিব যে-ই মেজবানের আয়োজন করুক না কেন, এতে অতিথির সংখ্যা নিরূপণ করে আয়োজন সম্ভব নয়। যত অতিথি আসুক না কেন, সবার মাঝে খাবার পরিবেশনই পরিপূর্ণ মেজবানের বৈশিষ্ট্য। 

চট্টগ্রামের দক্ষ বাবুর্চিরা ব্যস্ত মেজবানের রান্নার কাজে

গবেষকদের মতে, দশ শতকের পর চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত। বন্দরকে কেন্দ্র করে তখন থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচনা হয় এ অঞ্চলে। পর্তুগিজ, আরব ও বিভিন্ন অঞ্চলের বহু মুসলিম মনিষী এখানে আসতে শুরু করেন। 

বায়েজিদ বোস্তামি, বদর শাহদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বার আউলিয়া চট্টগ্রামে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। সে সময় ধর্মপ্রচারকরা পরিবর্তিত কমিউনিটিকে নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত করাতে মেজবান বা গরুর মাংসের মাধ্যমে ভোজের আয়োজন শুরু করেন। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রথায় পরিণত হয়েছে এ মেজবান। মুসলিম ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এতে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন। তাদের জন্য থাকে বিকল্প খাবার ব্যবস্থা। 

ঐতিহ্যবাহী এ মেজবান নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকেরা অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যেমন: ‘কালামন্যা ধলামন্যা আনের আদা জিরা ধন্যা আর ন লাগে ইলিশ-ঘন্যা গরু-খাসি বুটের ডাইলর বস্তা দেখা যায়- মেজবানি খাতি আয়...’।

মেজবানের জন দক্ষ বাবুর্চিদের রান্না করা খাবার

এখানে ইলিশ ও অন্যান্য সুস্বাদু মাছের তুলনায় গরু-খাসি ও বুটের ডালের মেজবানকে লোভনীয় ও মজাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গত কয়েক দশকে চট্টগ্রামের মেজবান ছড়িয়ে পড়েছে দেশ ও দেশের বাইরে। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় শোক দিবসে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ৩০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানের আয়োজন করে আসছিলেন চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও চসিকের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। যা এখনও চলমান। 

এর আগে, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানের আয়োজন করে চট্টগ্রামে রাউজান থানা আওয়ামী লীগ। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেজবানের আয়োজন করে থাকেন চট্টগ্রাম কমিউনিটির লোকেরা। চাটগাঁয়ের এ ভোজন সংস্কৃতি দিন দিন হয়ে উঠছে জনপ্রিয়।

View Source