গৌরবোজ্জ্বল ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’

2 weeks ago 11

বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে। বাবা আব্দুস সামাদ ও মা সৈয়দা মুবারকুন্নেসা। ৯ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন মতিউর।

মতিউর রহমান ১৯৬১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ছুটিতে এসে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং ভৈরবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছুটি শেষে মে মাসে পাকিস্তান ফিরে যান এবং সেখান থেকে একটি বিমান ছিনতাই করে আনার পরিকল্পনা করেন। তার লক্ষ্য ছিল বিমান নিয়ে বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট সকালে করাচির মৌরীপুর (বর্তমানে মাশরুর) বিমান ঘাটি থেকে একটি টি-৩৩ বিমান নিয়ে ভারতের জামনগর বিমান ঘাঁটির দিকে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি বৈমানিক রশিদ মিনহাজের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন মতিউর। ওই সময় ভারতীয় সীমান্তের কাছে থাট্টা নামক স্থানে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে শহিদ হন মতিউর রহমান। পরে মাশরুর বিমান ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

দেশপ্রেম ও আত্মদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মতিউর রহমানকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন মাশরুর বিমান ঘাঁটি থেকে তার দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 

২০০৮ সালের ৩১ মার্চ বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের নামে রামনগরের নাম পরিবর্তন করে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’ রাখা হয়। ২০১৬ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ গেজেট আকারে স্বীকৃতি লাভ করে।

নরসিংদী জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’। স্বাধীনতার পর কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার সীমানা সংলগ্ন এ গ্রামে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। এখন সড়ক পথই হলো যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ভৈরবের আগে মাহমুদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে নামলেই দক্ষিণ পাশে চোখে পড়বে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ম্যুরাল ও ভাস্কর্য। বাসস্ট্যান্ডের প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’।

‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর’র বাসিন্দা মো. ইমরান হোসাইন জানান, গ্রামের মানুষ এখন আর অবহেলিত নয়। অতীতের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে এ গ্রাম। গ্রামের মানুষ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে নিয়ে গর্বিত। তাকে নিয়ে কোনো বিভেদ-বিভাজন নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের পৈতৃক নিবাস নীরব, নিস্তব্ধ। তবে আশপাশের অনেক বাড়িঘরে বসবাস করছেন মতিউর রহমানের অধিকাংশ বংশধর। তারা জানান, মতিউর রহমানের পরিবারের লোকজন থাকেন ঢাকায়। তবে গ্রামের স্বজনদের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ করেন এবং বিভিন্ন উৎসবে বাড়িতে যান।

জানা গেছে, বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান থাকেন ঢাকায়। তার দুই মেয়ে মাহিন এবং তুহিন আছেন আমেরিকায়। তারা সেখানকার নাগরিকত্ব লাভ করেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের নামে এ গ্রামে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান কলেজ। এছাড়া রয়েছে দুটি প্রাইমারি স্কুল, চারটি কিন্ডারগার্টেন, একটি দাখিল মাদরাসা, একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, একটি মহিলা মাদরাসা, একটি হাইস্কুল। নতুন মাত্রা যোগ করেছে মতিউর রহমানের নামে জাদুঘর ও পাঠাগার। পাঠাগারটিতে রয়েছে প্রায় চার হাজার বই।

বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানকে নিয়ে গর্বিত নরসিংদীর মানুষ। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ মতিউর রহমানের গ্রামের প্রবেশপথ মাহমুদাবাদ বাস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় তোরণ ও ভাস্কর্য স্থাপন করেছেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবু হেনা মোরশেদ জামান।

View Source