কেনাবেচা হচ্ছে ১৪০০ বছরের রামপাল দিঘী

2 weeks ago 11

ইতিহাস থেকেই মুছে যেতে বসেছে সেন বংশের এই স্মৃতি চিহ্ন।

ইতিহাস থেকেই মুছে যেতে বসেছে সেন বংশের এই স্মৃতি চিহ্ন।

দখলের উৎসবে হারিয়ে যাচ্ছে ১৪০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ মুন্সিগঞ্জ সদরের রামপাল দিঘী তথা রাজা বল্লাল সেনের দিঘী। 

মুন্সিগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ এই দিঘী আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ইতিহাস থেকেই মুছে যেতে বসেছে সেন বংশের এই স্মৃতি চিহ্ন।

রাজা বল্লাল সেনের এই দিঘী ১৪০০ বছর আগের হলেও ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি দেখিয়ে এখন কেনাবেচা হচ্ছে। কয়েক বছর দিঘীর ২৬ শতাংশ জমি এলাকার প্রয়াত মরণ দালালের পরিবারের কাছ থেকে কিনেছেন সদর উপজেলার রামপাল ইউপির দালালপাড়া গ্রামের মো. সালাহউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। এরপর তিনি সেখানে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করেছেন। আর এই কেনাবেচার মধ্য দিয়ে দখল হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বল্লাল সেনের দিঘী। 

সালাহউদ্দিনের মতোই দিঘীর ৩৮ শতাংশ কিনেছেন আব্দুর রহমান। সিএস ও আরএস রেকর্ডে ব্যক্তি মালিকানা দেখিয়ে মাত্র ৬ বছর আগে আব্দুর রহমান নামে ওই ব্যক্তি দিঘীর ৩৮ শতাংশ কিনে এখন মালিক বনে গেছেন। মাত্র ১০০ বছর আগে সিএস রেকর্ড পদ্ধতির আর্ভিভাব হলেও ১৪০০ বছরের আগের ইতিহাসের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী বল্লাল সেনের দিঘী কেনাবেচা শুরু হয়েছে সবে মাত্র কয়েক বছর আগে।

দখলের উৎসবে হারিয়ে যাচ্ছে ১৪০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ মুন্সিগঞ্জ সদরের রামপাল দিঘী তথা রাজা বল্লাল সেনের দিঘী। 

ঐতিহ্যের ধারক বাহক এই দিঘীর বেশির ভাগ অংশই আজ ব্যক্তি মালিকানার সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। দিঘীর মাত্র ১৪ শতাংশ বর্তমানে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডে রয়েছে। কাজেই প্রশ্ন হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম অংশ বল্লাল সেনের দিঘী কিভাবে ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি হয়ে উঠেছে-তার সদুত্তর নেই খোদ ভূমি কর্মকর্তাদের কাছেও।  

স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দিঘীর যে অংশ কেনাবেচার পর স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে সেই স্থানটি আরএস রেকর্ডে রামপাল ইউপির গোবিন্দপুর মৌজার ৩১৮ নম্বর দাগের অর্ন্তভূক্ত। তাছাড়া আরএস রেকর্ডে দিঘির সম্পত্তিতে মালিকানায় নাম রয়েছে ইসমাইল গং ৩৩ শতাংশ, পুনাই দালাল ও হাজী অখিল উদ্দিন দালাল গং ১ একর ৩ শতাংশ, কালাচাঁন দেওয়ান ও আব্দুল হাই দেওয়ান গং ১৬ শতাংশ, আব্দুর রহমান ও মনিরুজ্জামান গং ৩৮ শতাংশসহ কমপক্ষে ৫ শতাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে।

রামপাল দিঘী তথা রাজা বল্লাল সেনের দিঘী

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিঘীটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট আর প্রস্থে ছিল ৮০০ ফুট আকৃতির। কিন্তুু চারিদিকে বসত-বাড়ি নির্মাণ, মার্কেট নির্মাণ ও জমি ভরাট কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় সংকুচিত হয়ে ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে দিঘী। এতে দিঘীর পুরনো সেই রুপ আর নেই। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে বল্লাল সেনের এই দিঘীর চিহ্ন আজ মুছে যেতে বসেছে।  

স্থানীয়দের অভিযোগ, যে সব ব্যক্তি জমি ভরাটের পর ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছেন, তারা এ সম্পত্তি নিজেদের এবং ক্রয়সূত্রে মালিক বলে দাবি করছেন। স্থানীয় ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারা বিগত কয়েক বছর ধরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করে যাওয়ায় দখল উৎসবে আজ হারিয়ে যাচ্ছে এই দিঘী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ঐহিত্যবাহী বল্লাল সেনের রামপাল দিঘীর পশ্চিম অংশে মাটি ভরাট চলছে। করা হচ্ছে একাধিক দ্বিতল ভবন নির্মাণ, দক্ষিণ প্রান্তে ধলাগাঁও বাজার সংলগ্ন আলু সমিতির মার্কেটসহ একাধিক মার্কেট নির্মাণ। এমনকি দিঘীর চারপাশেই নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর-বাড়ি। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করা বল্লাল সেনের রামপালের দিঘী। 

ঐতিহ্যবাহী রামপাল দিঘির ৪৫ একরের বেশি সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানা থাকায় কেনাবেচার মধ্য দিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে দখল উৎসব চলছে।

খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, সিএস ও আরএস রেকর্ডে রাজা বল্লাল সেনের আমলে তৈরি মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রামপাল দিঘির ৪৫ একরের বেশি সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানা থাকায় কেনাবেচার মধ্য দিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে দখল উৎসব চলছে।
 
কথিত আছে, রাজা বল্লাল সেনের শাসনামলে এ অঞ্চলে পানির তীব্র কষ্ট দেখা দেয়। এতে রাজা বল্লাল সেন প্রজাদের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করতে ঘোষণা দেন- এক রাতের মধ্যে তার মা যতটা রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে পারবেন, ঠিক ততটুকু জায়গায় তিনি দিঘী খনন করবেন। এরপর এক রাতে রাজমাতা হাঁটা শুরু করে বল্লাল সেনের ধারণার চেয়েও বেশি এলাকা পায়ে হেঁটে চলে যান। তাই ছলনার মাধ্যমে বল্লাল সেন তার মায়ের পথ রোধ করেন। পরে তার ঘোষণা অনুযায়ী বিশাল দিঘী খনন করলেও মায়ের সঙ্গে ছলনা করায় দিঘীতে পানি আসে না। 

এতে রাজা বল্লাল সেনের সম্মান বাচাঁতে মন্ত্রী রামপাল জানালেন-প্রাণ বিসর্জন দিলে পানি আসবে। কেননা, রাম সাগরের রাজা রাম নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এতে বল্লাল সেনও তাই করতে গেলেন। কিন্তুু রামপাল তার বন্ধু বল্লাল সেনকে খুব ভালোবাসতেন। তাই বন্ধুকে বাচাঁতে রামপাল নিজের জীবন বিসর্জন দিতে দিঘীর অতলে নামেন। আর সঙ্গে সঙ্গে দিঘীতে পানি উঠতে থাকে। আর সেই পানির তোড় অনেক বেশি থাকায় রামপাল প্রাণ বিসর্জন দেয়। তাই বল্লাল সেন দিঘীর নামকরণ করে রামপালের দিঘী। 

View Source