করোনাভাইরাস সংক্রমণে ঘ্রাণের বিকৃতি: যা জানা প্রয়োজন

2 months ago 45

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে স্বাস্থ্য সমস্যার একটি উপসর্গ আলোচনায় উঠে এসেছে। উপসর্গটি হলো, সাময়িকের জন্য ঘ্রাণ অনুভবের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। এটাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় অ্যানোসমিয়া বলা হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অনেকেই ঘ্রাণশক্তি হারানোর অভিযোগ করেছেন।

বর্তমানে প্রায় একই ধরনের, কিন্তু অদ্ভুত একটি উপসর্গও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপসর্গটি হলো ঘ্রাণের অনুভূতিতে বিকৃতি। এটাকে মেডিক্যালের পরিভাষায় পারোসমিয়া বলা হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- যেসব কোভিড-১৯ রোগী ঘ্রাণশক্তি হারিয়েছেন, তাদের ঘ্রাণের অনুভূতিতে বিকৃতিও ঘটেছে।

পারোসমিয়া বা ঘ্রাণের বিকৃতি রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে বেশিরভাগ রোগীই জানান যে, খুবই বাজে ঘ্রাণ অনুভব করেছেন। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত অনেক রোগীর কাছে কিছু খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদের বিকৃতি এতটাই জঘন্য লেগেছে যে দ্বিতীয়বার মুখে দেয়ার সাহস করেননি। এমনকি পারোসমিয়ার কারণে কেউ কেউ নিজের প্রিয় খাবারটিও বাদ দিয়েছেন।

আপনার নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে- ঠিক কেন ঘ্রাণের বিকৃতি ঘটে? করোনাভাইরাস সংক্রমণে পারোসমিয়া হলে তার চিকিৎসাই বা কী? এখানে বিষয়টি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে বলা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের মতে, ঘ্রাণের স্বাভাবিক অনুভূতির পরিবর্তনকে পারোসমিয়া বলে। কোনো পরিচিত কিছুর ঘ্রাণকে অন্যরকম লাগলে বুঝে নিতে পারেন যে পারোসমিয়া হয়েছে। এই উপসর্গে ঘ্রাণ ও স্বাদ বিবেচনায় খুবই চমৎকার কোনো খাবারকে খুবই বাজে মনে হতে পারে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অটোল্যারিঙ্গোলজি- হেড অ্যান্ড নেক সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক এরিক হোলব্রুক বলেন, ‘সাধারণত ঘ্রাণের বিকৃতি চিরস্থায়ী হয় না, তবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপসর্গটি থেকে যেতে পারে।’ বেশিরভাগ রোগীর পারোসমিয়া দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে দূর হয়ে থাকে, কিন্তু কিছু লোকের ক্ষেত্রে এর স্থায়িত্ব কিছু মাস হতে পারে।

পারোসমিয়া হলে সকলের ঘ্রাণানুভূতিতে একই ধরনের বিকৃতি ঘটা অবধারিত নয়। একেকজনের পারোসমিয়ার অভিজ্ঞতা একেক রকম হতে পারে। কারো খুবই বিদঘুটে লাগতে পারে। কারো কাছে বেবি অয়েলের মতো মনে হতে পারে। আবার কারো কাছে মনে হতে পারে যে আবর্জনা থেকে গন্ধ আসছে। কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা পেতে অনেকেই পানীয়তে মিশিয়ে লেবুর রস খেতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু হঠাৎ করেই কেউ কেউ অনুভব করেছেন যে আবর্জনার গন্ধ পাচ্ছেন। কেউবা কফি পান করতে গিয়ে এরকম গন্ধ পেয়েছেন। পারোসমিয়ার এসব অভিজ্ঞতা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জানা গেছে। এভাবে আরো অনেক ধরনের পারোসমিয়া ঘটতে পারে। ডা. হোলব্রুক বলেন, ‘পারোসমিয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই কিছুটা অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে কারো কারো কাছে উপসর্গটি বাজে নয়, অর্থাৎ ঘ্রাণের পরিবর্তনটি জঘন্য হয় না।’

কেবল কোভিড-১৯ নয়, অন্যান্য ভাইরাসের আক্রমণেও ঘ্রাণের বিকৃতি ঘটতে পারে। যেকোনো ভাইরাস সংক্রমণে ঘ্রাণশক্তি হারানোর পর ঘ্রাণানুভূতিতে পরিবর্তন আসতে পারে, অর্থাৎ অ্যানোসমিয়ার পরে পারোসমিয়া। ভাইরাস ছাড়া অন্যান্য কারণেও পারোসমিয়ার অভিজ্ঞতা হতে পারে, যেমন- মস্তিষ্কে আঘাত। মস্তিষ্কে আঘাত পেলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্বাদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত অংশসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঘ্রাণানুভূতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

পারোসমিয়ার চিকিৎসা আছে? না, যেমনটা আশা করেছেন তেমনটা নেই। অর্থাৎ এখনো পর্যন্ত ওষুধের মাধ্যমে পারোসমিয়া দূর করার উপায় উদ্ভাবন হয়নি। তবে ওলফ্যাক্টরি ট্রেইনিং বা সেন্ট ট্রেইনিং নামে পরিচিত এক ধরনের এক্সারসাইজ রয়েছে, যার চর্চা অব্যাহত রাখলে তুলনামূলক দ্রুত সময়ে ঘ্রাণের অনুভূতিকে পুনরায় স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে। এই ট্রেইনিংয়ে নির্দিষ্ট কিছুর ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে চিন্তা করতে হয় যে এটার ঘ্রাণ কেমন হওয়া উচিত। অর্থাৎ যদি আপনি লেবু শুঁকেন, তাহলে এটার স্বাভাবিক ঘ্রাণ মনে করার চেষ্টা করুন। গবেষণায় আশাপ্রদায়ক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে এটা বেশ কার্যকরী চিকিৎসা হতে পারে। ছয় মাসের একটি গবেষণায় যারা সেন্ট ট্রেইনিং করেছিলেন তাদের মধ্যে নির্ভুল ঘ্রাণানুভূতি বেশি ছিল।

যদি কেউ ধারণা করেন যে তার ঘ্রাণের বিকৃতি ঘটেছে, তাহলে তার কী করা উচিত? এ প্রসঙ্গে ডা. হোলব্রুক বলেন, ‘অ্যানোসমিয়া বা পারোসমিয়া হলে ঘরে সেন্ট ট্রেইনিং করলেও একজন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। আপনার প্রকৃত কারণ শনাক্তকরণের চেষ্টা করা উচিত।’

Read Entire Article