একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু

1 month ago 26

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার পঙতি পড়ে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কীর্তিমানের আসলেই মৃত্যু নেই। যতকাল রবে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ, ততকাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু থাকবেন সবার হৃদয়ে। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র ৪৪ মাস। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু প্রথমে লন্ডনে যান। সেখান থেকে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে ১২ জানুয়ারি প্রত্যক্ষভাবে আসীন হন। 

তার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমসিএদের একত্র করে এক অধিবেশন ডাকেন। অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ও ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর মুহূর্ত থেকে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত হন। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু এত ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন যে, তা সীমাবদ্ধ শব্দের লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবু একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সহস্র সফলতার মধ্য থেকে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-

মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ: ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সমর্পণের আহ্বান জানান। এতে সব মুক্তিযোদ্ধা সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন: মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পুলিশ বাহিনী, মিলিশিয়া, রিজার্ভ বাহিনী গঠনের বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

ত্রাণ কার্যক্রম: রিলিফ ও পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে মঞ্জুরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। 

ভারতীয় বাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে।

১৯৭২ সালের সংবিধান: ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর রচিত হলো রক্তে লেখা এক সংবিধান। 
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: স্বাধীনতা অর্জনের পর দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে জাতির জনক প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

পররাষ্ট্রনীতি: বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরী মনোভাব নয়।’ প্রথম তিন মাসের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ৬৩টি দেশের স্বীকৃতি লাভ। ৩ মাস ২১ দিনের মধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় দুই বছর দুই মাসের মধ্যে। সর্বমোট ১২১টি দেশ স্বীকৃতি দেয়। 

ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন: ইসলামের যথার্থ শিক্ষা ও মর্মবাণী সঠিকভাবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচার-প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার: বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল অর্ডার’ জারি করে। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিরুদ্ধচারণকারী হানাদার বাহিনীকে সাহায্যকারী রাজাকারদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসেন।

হজ্জে প্রেরণ: ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে ছয় সহস্রাধিক বাংলাদেশি মুসলমানকে হজ্জ পালনে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি: ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত হয় ‘২৫ বছর মেয়াদি’ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি।

শিক্ষা কমিশন গঠন: কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন।

যমুনা সেতু: ১৯৭৩ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপান সফরকালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সূচনা করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন: স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ: জাতিসংঘের বেশির ভাগ সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ গ্রহণ।

বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ: ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ প্রদান।

প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন: ১৪-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন হয়। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।

ঐতিহাসিক কিছু পদক্ষেপ: ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, পাঁচ হাজার টাকার ওপরে কৃষিঋণ মওকুফকরণ এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে এনে সামাজিক অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জমি মালিকানার সিলিং পুনর্নির্ধারণ ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা: বঙ্গবন্ধু সরকার নগর ভিত্তিক ও গ্রামীণজীবনের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডাক্তারকে গ্রামে নিয়োগ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আইজিএমআর শাহবাগ হোটেলে স্থানান্তর হয়। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প গ্রহণ বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আজও স্বীকৃত।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি: ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশকে শিল্প-সংস্কৃতিবদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন এবং বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধরে রেখে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশি শিল্পকলা একাডেমি গঠন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। 

বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু: শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারকে শুরু করতে হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য। এ ছাড়া জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের ছাপ রাখতে সমর্থ হন। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ এবং বিশ্বশান্তির প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় সমর্থন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করে ‘জুলিওকুরি’ শান্তিপদক।

দুর্নীতির বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা: ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ তমসায় ছেয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাচালানি, মজুদদারি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বলে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদের শায়েস্তা করে জাতীয় জীবনকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে আওয়ামী লীগের দুই যুগের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানের গৌরবও ম্লান হয়ে যেতে পারে।

কিশোর বয়স থেকেই তিনি মানুষের কথা ভেবেছেন। তাদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে, ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর।’

বঙ্গবন্ধু মানুষকে ভালোবাসার মূল্য দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। আধুনিক রাষ্ট্রের মৌল চিন্তায় তিনি ছিলেন দূরদর্শী ও আধুনিক মনের অধিকারী। ঘাতকদের বুলেট ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছেন কোটি বাঙালি মানসপটে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ। 

Read Entire Article