আজও মলিন বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতি

3 weeks ago 17

 ডেইলি বাংলাদেশ

বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়া ইউনিয়নে হানাদার বাহিনীর একটি বাংকার ধ্বংস করতে গিয়ে শত্রুর গুলিতে নিহত হন। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার ৫০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্মৃতি প্রায় মলিন হয়ে গেছে।

বরিশালের বাবুগঞ্জ থানার রহিমগঞ্জ গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বাড়ি, স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার সংরক্ষণের অভাব ও নদী ভাঙনের কারণে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। স্থানীয়রা বলছেন, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে জাতির এ বীর সন্তানের স্মৃতি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ। তার বাবা আবদুল মোতালেব হাওলাদার এবং মা মোসা. সানিয়া খাতুন। ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬৬ সালে আইএসসি পাস করে বিমান বাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু চোখের সমস্যা থাকায় ব্যর্থ হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ১৯৬৮ সালের ২ জুন ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় পাকিস্তানের ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাট্যালিয়নে দায়িত্বরত ছিলেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে কর্মস্থল ছেড়ে পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা পাড়ি দিয়ে আসেন। ৩ জুলাই পাকিস্তানে আটকে পড়া আরো তিনজন অফিসারসহ পালিয়ে যান তিনি। পরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদীপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭ নম্বর সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যোগ দেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের অধীনে রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোয় তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর দখলের দায়িত্ব দেয়া হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর দখলের জন্য তিনটি দল গঠন করেন মেজর নাজমুল হক। প্রথম দলের নেতৃত্ব পান মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস। দ্বিতীয় দলের দায়িত্ব দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা রশীদকে। তৃতীয় দলের দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়া এলাকায় অবস্থান নেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ১১ ডিসেম্বর সেখানে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর গোলাবর্ষণ করার কথা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। পরবর্তীতে ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর একাধিকবার মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে তাদের সহযোগিতা ছাড়াই পাক বাহিনীর বাংকারে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ১৪ ডিসেম্বর বারঘরিয়া মহানন্দ নদীর পারে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে তাদের চারটি বাংকারের মধ্যে তিনটিই ধ্বংস করে দেন। শেষ বাংকারটি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়তে গিয়ে শত্রু সেনাদের একটি গুলি মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কপালে বিদ্ধ হয়। বিজয়ের দুইদিন আগে শহিদ হন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। পরে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ আঙিনায় সমাহিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে দেয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ।

 ডেইলি বাংলাদেশ

বরিশালের রহিমগঞ্জ গ্রামের নাম মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের দাদার নামে হওয়ায় পরিবার ও গ্রামবাসীর ইচ্ছা অনুযায়ী তার ইউনিয়নের নাম আগরপুর থেকে পরিবর্তন করে জাহাঙ্গীর নগর রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের কারিগরি নির্দেশনায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবারের দান করা ৪০ শতাংশ জমির উপর বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছে বরিশাল জেলা পরিষদ। ২০০৮ সালের ২১ মে জাদুঘর ও গ্রন্থাগার উদ্বোধন করা হয়।

জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বসতবাড়ি, জাদুঘর ও গ্রন্থাগার এমন অবহেলিত থাকবে- কখনো আশা করিনি। ইতিহাস ও পাঠ্যবইতে জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানের নাম থাকলেও তার স্মৃতি সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতি জাদুঘর হওয়া উচিত ছিল দর্শনীয়। যেখানে শিক্ষার্থী, দর্শনার্থীরা আসবে। তারা মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জীবনী জানবে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বাড়ি ও জাদুঘরে রাতে ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আশপাশ দিয়ে চলাচল করতেই ভয় লাগে।

বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের চাচাতো ভাই হারুন অর রশীদ বলেন, ২০০৮ সালে উদ্বোধনের পর থেকে এখন পর্যন্ত জাদুঘরটির কোনো উন্নতি হয়নি। জাদুঘর ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় মানুষ এখানে আসতে পারে না। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হলে মানুষের এখানে আসতে সুবিধা হতো। এছাড়া নদী ভাঙনের কারণে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বাড়ি, জাদুঘর, তার নামে কলেজ ও স্কুল হুমকির মুখে পড়েছে। যেকোনো সময় এসব স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

Read Entire Article